উপহার হোক মনের মত

এই তো কিছুদিন আগেও গিফট শপে উপহারটা র‍্যাপিং করে দেয়ার পর ছোট্ট একটা জবরজং কার্ড সেঁটে দেয়া হত। কার্ডের গায়ে লেখা- প্রীতি উপহার।
উপহারদাতা সেই কার্ডে নিজের নাম ধাম লিখে গিফট প্যাকিং এর ষোলকলা পূর্ণ করতো।
পরস্পরের মাঝে সম্প্রীতি ধরে রাখতে উপহারের বিকল্প নেই বললেই চলে। কিন্তু আসলেই কি সব উপহার ‘প্রীতি উপহার’ হিসেবে বিবেচ্য?
এই ধরুন দু’হাত ভর্তি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে কারো বাড়িতে পৌঁছেই জানতে পারলেন, বাড়ির কর্তা কর্ত্রী উভয়েরই ডায়বেটিস। তারা উপহার গ্রহণ করলেন। কিন্তু ঐ যে বলা হয় প্রীতি উপহার! প্রীতি উপহারের ‘প্রীতি’র অনুপস্থিতি ঠিকই অনুভূত হল!
এমন বিড়ম্বনায় যাতে না পড়তে হয়, তাই আজ আলোচনা হবে উপহার উপঢৌকন নিয়ে।


সবার আগে বাজেট

“মিসেস রওশন আমাকে সবসময় দামি উপহার দিচ্ছেন, তাই তাকেও অনেক দামি কিছু দিতে হবে”- এ ধরণের চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসা উচিৎ। মনে রাখবেন, আপনি উপহার দিচ্ছেন, বিনিময় প্রথা প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছেন না।
বাজেট নির্ধারণে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, নিজের সাধ্যের বাইরে কিছু দেয়া চলবে না। সাধ্যের বাইরে কাউকে কিছু দেয়া হলে সেটা আর উপহার থাকে না, অনেকটা বোঝার মত হয়ে যায়।
বাজেট নিয়ে কখনোই হীনম্মন্যতায় ভুগবেন না। স্বল্প বাজেটেও মনে রাখার মত উপহার দেয়া সম্ভব। একটা উদাহরণ দেয়া যাক-
ধরুন কারো সন্তানের আর কিছুদিন পরই ৬ মাস পূর্ণ হবে। আপনি তার শিশুকে খাওয়ানোর জন্য এক জোড়া বাটি-চামচ উপহার দিতে পারেন। সন্তান যখন ছয় মাসে পা রাখবে, দুধের পাশাপাশি অন্য খাবার খাওয়াতে তার আর বাটি কিনতে হচ্ছে না!
উপহারের বাজেট হবে সীমার মাঝে, আর আন্তরিকতা হবে অসীম। তবেই না সেটা উপহার!

আমার পরাণ যাহা চায়

দোকানে গিয়ে কিছু একটা ভাল লেগে গেল। এতই ভাল লাগলো যে চট করে কারো জন্য কিনে ফেললাম।
উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে এ ভুলটাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি হয়। নিজের ভাললাগাকে প্রাধাণ্য দিতে গিয়ে আমাদের মাথায়ই থাকে না যে যার জন্য কিনছি, তার আদৌ ভাল লাগবে কি না!
তাই যার জন্য কিনছেন তার কথা আগে ভাবুন।
তার ভালোলাগা মুখ্য, আপনারটা গৌণ।

ভাবনা হোক বাক্সের বাইরে

উপহার নিয়ে আমাদের ভাবনাগুলো বেশ গৎবাঁধা। ঈদে মাকে শাড়ি, বাবাকে পাঞ্জাবি, আর বান্ধবীর বিয়েতে হয় ব্লেন্ডার নয়ত প্রেশার কুকার।
আজ পাঠকদের জন্য নতুন কিছু গিফট আইডিয়া দিচ্ছি।
মাকে একটা দামী শাড়ি কিনে দিন, আর দিন এক সেট প্লাস্টিক কন্টেইনার।
বলুন তো, মা কীসে সবচেয়ে বেশি খুশি? জ্বী, ঠিক ধরেছেন। মায়ের উচ্ছ্বাস প্লাস্টিক কন্টেইনার নিয়ে। প্রতিটি সংসারে মায়ের আদি ও অকৃত্রিম কনসার্ন হচ্ছে বক্স-বাটি। এ কনসার্নকে হেলাফেলা করবেন না।

নবজাতককে দেখতে গেলে সবাই গাদাখানেক জামা কাপড় নিয়ে হাজির হয়ে যাই। বাচ্চাদের গ্রোথ খুব বেশি। কাড়ি কাড়ি গিফটের জামার অর্ধেকই তাদেরকে পরানো যায় না শেষমেষ। তাই গতানুগতিক জামা কাপড় না নিয়ে এমন কিছু নিয়ে যান, যেটা কাজে লাগবে।
ফোনে গল্পের ছলে মায়ের থেকে বাচ্চার ডায়াপারের সাইজ জেনে নিতে পারেন। একবার ভাবুন, আপনার দেয়া এক সেট ডায়পার নতুন মা বাবার খরচ কতটা কমিয়ে দিল!

বান্ধবীর বিয়ে। এমন কিছু দিন যেটা সে নিজে ব্যবহার করতে পারবে। ব্লেন্ডার আর প্রেশার কুকার তো সব আত্মীয়স্বজন ভাগাভাগি করে নিয়েই যাচ্ছে। আপনি দিতে পারেন রূপচর্চার অর্গানিক সামগ্রী৷ ছোট ছোট সামগ্রীতে গিফট প্যাক সাজানোর একটা সুবিধা হল- কোনো না কোনো একটা প্রোডাক্ট বান্ধবীর পছন্দ হবেই!

নতুন সংসার সাজানো দম্পত্তিকে দেখতে ঢাউশ সাইজের ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক নিয়ে যাচ্ছেন? বেচারা দম্পত্তি এই কেক কয়দিনে খাবে বলুন তো? তার থেকে এক ডজন ডিম নিয়ে যান। নতুন সংসারে ‘এটা লাগবে’ ‘ওটা লাগবে’র ভীড়ে এক ডজন ডিমও যে কী ভীষণ স্বস্তি দিতে পারে! হতে পারে এই ডিমের কারণেই ঐ দম্পত্তি আজীবন আপনাকে মনে রাখবে!

পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন, শত চিন্তা ভাবনা আর আন্তরিকতার পরও যারা গোমড়া মুখে চায়, তাদের বেলায় কী উপায়!
সত্যি বলতে সবাই সাদরে উপহার গ্রহণ করতে জানে না। তাদের ব্যাপারে আপনার আমার কিছুই করার নেই। আমরা শুধু চেষ্টা করে যেতে পারি উপহারের মাধ্যমে সম্প্রীতি বাড়াতে, সম্প্রীতি ধরে রাখতে।

আফিফা আবেদীন
ফিচার রাইটার, ModestBD

 

Leave a Reply