ড. জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড: বাইপোলার ডিজঅর্ডার

কেস স্টাডি ১

আইরিশ মেয়ে সুযি ছিল তার পরিবারের মধ্যমণি।তার মতে সে তার মা-বাবার চোখে “Little Miss Perfect”. অন্যান্য ভাই-বোনরা বরং তার চেয়ে অনেক উচ্ছৃঙ্খল আর এলোমেলো।সবকিছু গুছিয়ে রাখা তার স্বভাব। কড়া মা বাবার চোখে স্পেশাল হতে চাওয়া মেয়েটা হঠাৎ পালটে গেলো। নির্বাচনের সময় না অথচ নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলো। বান্ধবীদের কাছে নিজেকে স্পেশাল একজন বলে দাবি করতে থাকলো। পরপর ৫ দিন ঘুম নেই সুযির চোখে,কাজ যেন শেষ হয় না।এর কয়দিন পরই সে প্রচণ্ড বিষন্ন হয়ে পড়ে।সামাজিক জীবন যাপনে অপারগ হয়ে যায়। ক্লাসে যাওয়া,বাসা থেকে বের হওয়া বাদ দিয়ে দেয়।এভাবে সপ্তাহখানেক ‘অতিমানবী’ সপ্তাহখানেক বিষন্ন থাকার পর আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় সুযি।খোঁজ নিয়ে জানা যায় তার নানার মানসিক সমস্যা ছিল।

 

কেস স্টাডি ২

ঢাকার ভূতের গলির বাদশাহ, সত্যিকার নাম কারো জানা নেই। পাগল বলেই জানে সবাই। সে নিজেকে এলাকার বাদশাহ বলে দাবি করে। কেউ ফকির বললে ক্ষেপে মারতে যায়। আবার কখনো সে থাকে সম্পূর্ণ লোকচক্ষুর আড়ালে।

 

স্কটিশ লেখক রবার্ট লুইস স্টিভেনসনের ভৌতিক উপন্যাস Strange Case of Dr. Jekyll and Mr. Hyde হয়তো অনেকেরই পড়া। একজন মানুষের ভেতর খারাপ ভালো দুটোই থাকে। ড: জেকিল রাসায়নিক পান করে মি: হাইড হয়ে খারাপ কাজগুলো করতেন যেন তার বদনাম না হয়। এক সময় নিজের ইচ্ছামত মি: হাইডে রূপ নেয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। না চাইতেও জেকিল কখনো কখনো মি: হাইড হয়ে যান। খুনের আসামী হন মি: হাইড। মিঃ হাইড ফেরারী হন আর মিঃ জেকিল নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। শেষমেষ রহস্যের জট খুলেন মি: জেকিলের  আইনজীবী আটারসন। উপন্যাসটা এতো বেশি খ্যাতি লাভ করে যে কারো আচরণে বৈপরীত্ব দেখা দিলে তা “ড. জেকিল ও মিঃ হাইড” বাগধারা দিয়ে বিশেষায়িত করা হয়।

 

বাইপোলার ডিজঅর্ডার এমন একটি মানসিক সমস্যা যেখানে মানুষের মধ্যে দুই বিপরীত মেরুর আচরণ দেখা যায়। অনেকে এই রোগের সাথে “ড. জেকিল ও মিঃ হাইড” এর তুলনা করলেও তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ এই রোগে দুই মেরুর আচরণ দেখা গেলেও তা মানুষের খারাপ দিক আর ভালো দিকের সাথে তুলনীয় নয়। বাইপোলার ডিজঅর্ডারের একজন রোগী যে দুই পোল (pole) বা  মেরুর আচরণ অনুভব করে তার একটি ডিপ্রেশন অন্যটি ম্যানিয়া। ডিপ্রেশন বা বিষন্নতা এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে থাকবে। আত্মবিশ্বাস কমে যায়, নেগেটিভ চিন্তা মনে দানা বাঁধে, আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়। সামাজিক জীবন বোঝার মতো মনে হয়। রোগী অল্পতেই কাঁদতে থাকে। নিজেকে তুচ্ছ ও ব্যর্থ মনে করতে থাকে। অপরদিকে ম্যানিয়া পিরিয়ডে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে। ঘুম কমে যায়।রোগী নিজেকে অনেক ক্ষমতাবান ভাবা শুরু করে। মেজাজের তারতম্য দেখা যায়, কেউ কেউ বদমেজাজী হয়ে যায়। দ্রুত কথা বলতে থাকে। অনেক টাকা ইনভেস্ট করে ফেলে বা দান করে ফেলে। এধরনের রোগীরা অনেক সময় দেউলিয়া হয়ে যায়। ম্যানিয়া এপিসোডও চলে সপ্তাহখানেক। পর্যায়ক্রমে ডিপ্রেশন ও ম্যানিয়া আসা যাওয়া করে।

 

বাইপোলার ডিজঅর্ডারের প্রধাণ প্রভাবক মূলত জেনেটিক সমস্যা। পূর্বপুরুষে এ রোগ থাকলে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া পূর্বপুরুষে এ রোগ না থাকলেও হয়তো পারিবারিক জিনের কোনো মাইনর ফ্যাক্টর প্রভাবশালী হয়ে যায় পরবর্তী জেনেরেশনের জন্য। সমাজ ও পরিবেশও প্রভাব বিস্তার করে। শৈশবে পাওয়া কোনো শারীরিক বা মানসিক আঘাত এই ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। পারিবারিক অশান্তি থেকে এ রোগের বীজ জন্ম নিতে পারে। সারা বিশ্বের জনসংখ্যার মাত্র ১% এই রোগে আক্রান্ত।

 

সাধারণত মুড নিয়ন্ত্রক ওষুধ রোগীদের আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। এক্ষেত্রে লিথিয়াম ট্যাবলেট কার্যকর। ম্যানিক পিরিয়ডে এন্টিসাইকোটিক ট্যাবলেট ও ডিপ্রেশন পিরিয়ডে এন্টিডিপ্রেসেন্ট ট্যাবলেট সহায়তা করে। ওষুধের পাশাপাশি এ রোগীদের কাউন্সেলিং করাতে হয়।


বাইপোলার ডিজঅর্ডারের রোগীদের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো তারা বেশিরভাগই ক্রিয়েটিভ হয়ে থাকে। বিনোদন জগতের অনেকের মাঝেই এই রোগ প্রকট। এমনটা হওয়া অসম্ভব না যে তাদের অনিয়ন্ত্রিত জীবন তাদের কখনো প্রচন্ড বিষন্নতা আবার কখনো ম্যানিয়া দিয়ে থাকে। সিবিসি নিউজ অনুসারে পহলিউডের প্রচুর খ্যাতিমান ব্যাক্তি বাইপোলার ডিজঅর্ডারে ভুগছেন। গায়িকা মারিয়াহ ক্যারেই, অভিনেত্রী ক্যাথেরিন যেটা জোন্স, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের জনপ্রিয় নেতা উইন্সটন চারচিল,  আঁকিয়ে ভ্যান গগ সমূহ বাই পোলার  ডিজঅর্ডারের ভয়াল থাবার শিকার। অনেক সময় খ্যাতির চূড়ায় থাকলেও অনেক শিল্পীই বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।

 

 

 

উম্মে সারাহ
ফিচার রাইটার, ModestBD

 

Leave a Reply