আমার চোখে পৃথিবীঃ Malaysia-Truly Asia

ছোটবেলায় টিভিতে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্স কিংবা মালয়েশিয়ান ট্যুরিজমের এড দেখতাম যেখানে স্লোগান ছিলোঃ Malaysia-Truly Asia। এই দেশে আসার পর কিছুটা অনুধাবন করতে পারলাম এই স্লোগানের পেছনের কারণ।

আমার চোখে প্রধান কারণ হিসেবে যা ধরা পড়েছে তা হলো এই দেশে এশিয়ার প্রধান তিন জাতি মালয়েশিয়ান, চাইনীজ ও ইন্ডিয়ানদের সহাবস্থান। ২০১৭ সালের রেকর্ড অনুযায়ী ৬৯.১% ভূমিপুত্র (যারা হলো অরিজিনাল মালয়েশিয়ান), ২৩% চাইনীজ, ৬.৯% ইন্ডিয়ান আর ১% অন্য জাতির বসবাস এই দেশে। আবার মোট জনসংখ্যার ১০.২৪% হলো নন-সিটিজেন। আপনি মালয়েশিয়াতে কিছু সময় ঘুরলেই দেখতে পাবেন সুন্দর সুন্দর মসজিদ, চাইনীজদের উপাসনালয় আবার ইন্ডিয়ানদের মন্দির। যেকোন জনবহুল এলাকায় একটু হাঁটলেই একইসাথে শুনতে পাবেন মালয়, মান্ডারীন চাইনীজ, তামিল, ইংলিশ সহ আরও দেশের ভাষা। এই দেশের সংস্কৃতি, উৎসব, ঐতিহ্য ও রীতিনীতিতে এত এত বৈচিত্র্য এশিয়ার আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই।

রাতের আলোকোজ্জ্বল টুইন টাওয়ার; চোখ ধাধানো সুরিয়া কেএলসিসি; শপিং এর জন্য বিখ্যাত বুকিত বিনতাং, প্যাভিলিয়ন; অটোমেটেড-ড্রাইভারলেস MRT ট্রেন সহ উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা সমেত মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর এশিয়ার এক প্রধান নগরী হিসেবে সগর্বে মাথা তুলে আছে। ঠিক তেমনি এই শহুরে জীবনের বাইরে আছে আল্লাহ্‌র দেওয়া অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতি ও তার মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য। 

মালয়েশিয়াতে আপনি পাবেন বীচ, আইল্যান্ড, রেইনফরেস্ট সাথে আশেপাশে দেখতে পাবেন সবুজ পাহাড়ের বেষ্টনী। মাঝে মাঝে কিছু পাহাড় দেখলে মনে হয় পৃথিবীর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কোন অতন্দ্র প্রহরী যার ওইপারে আর কিছুই নেই।

Truly Asia বলার আরেকটা কারণ হলো মালয়েশিয়ার ফুড। মালয়েশিয়াকে অনেক ট্রাভেলার বলে ফুড প্যারাডাইস। বহুজাতিক মানুষ একসাথে বসবাস করার প্রভাব মালয়েশিয়ান খাবারেও প্রকটভাবে বিদ্যমান। যেমন একটা খাবারের নাম হলো Char Kway Teow – চার কোয়ে তিয়াও। এটা হলো চাইনীজ চ্যাপ্টা রাইস নুডলসের মালয়েশিয়ান ভার্সন। এই চাইনীজ নুডলসের ইন্ডিয়ান স্পাইসের এরোমা প্লাস মালয়েশিয়ান ফ্লেভার যোগ করে মালয়েশিয়ানরা নিজেদের মতো করে নিয়েছে। এছাড়াও আছে বিভিন্ন প্রজাতির মজার মজার ফল। মালয়েশিয়ান জাতীয় ফল ডুরিয়ান; এর গন্ধে আমি ডুরিয়ানের কাছেও ঘেষতে পারিনি। মালয়েশিয়াতে সারাবছর গরম থাকায় এই দেশীয়রা প্রচুর ড্রিংকস খায়। ঠান্ডা পানি, ডাবের পানি, বিভিন্ন রকমের ফলের জুস এইখানে কম বেশী সব জায়াগায় পাওয়া যায় আর খেতেও মজা। আরও আছে ওদের ট্রেডিশনাল চা তো তেরিক (Toh Terik) যার ঠান্ডা গরম দুইটা ভার্সন প্রচলিত।

মালয়েশিয়া ট্যুরিষ্টদের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটা বড় কারণ হলো এই দেশ খুব বাজেট ফ্রেন্ডলি। ওয়েস্ট প্লাস পার্শ্ববর্তী সিঙ্গাপুরের তুলনায় মালয়েশিয়ায় থাকা খাওয়ার খরচ কম। ওয়েস্ট থেকে আসা যে কেউ প্রথমেই অবাক হয় এখানে রেষ্টুরেন্টে বিল দিতে গিয়ে। আরেকটা কারণে মালয়েশিয়া খুব জনপ্রিয় স্পেশালি মুসলিম ট্যুরিষ্টদের কাছে তা হলো সবখানে হালাল ফুড আর নামাজের জায়গা, আলহামদুলিল্লাহ্‌। এই দেশে আপনি হালাল কেএফসি, ম্যাকডোলান্ড, বার্গার কিং, থেকে শুরু করে চাইনীজ, জাপানীজ, কোরিয়ান, মিডল ইষ্টার্ন, ওয়েস্টের নামী ফুড সব পাবেন এবং সব হালাল ভার্সন আলহামদুলিল্লাহ্‌। সাথে আপনি চলতে ফিরতে মসজিদ নয়তো সুরাও (নামাজের জায়গা) পেয়ে যাবেন ওযু করার জায়গা সহ।

মালয়েশিয়ান খাবারের সাথে আমার প্রথম পরিচয় অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে। আমার ইউনিতে অনেক মালয়েশিয়ান মেয়েরা পড়তো যারা মাঝে মাঝে ওদের দেশীয় খাবার বানিয়ে মুসল্লায় এনে বিক্রি করতো কিংবা কেউ এমনি শেয়ার করতো। অস্ট্রেলিয়া থাকতে সবচেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম মালয়েশিয়ান রোটি চানাই (Roti Canai) আর সেরি মুকা (Seri Muka) (এটা এক প্রকার ডেজার্ট) খেয়ে। মালয়েশিয়া আসার পর আরও অনেক কিছু খাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে আলহামদুলিল্লাহ্‌।

ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক মাইগ্রেশান, এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবে মালয়েশিয়ান কুইজিনে অনেক দেশের প্রভাব যেমন বিদ্যমান; তেমনি একইসাথে এসব কারণে মালয়েশিয়ান খাবার অনেক বেশী বৈচিত্র্যময়। পনেরশ শতাব্দীর শুরুর দিকে আরব বণিক দল মেলাকায় আগমন করে ব্যবসার পাশাপাশি ইসলামের প্রচলন করে। তখন মেলাকার সুলতান ইসলাম গ্রহণ করে যা ইন্দোনেশিয়া ও অন্য আরব দেশের সাথে ব্যবসার প্রসারে আরও সাহায্য করে। ধারণা করা হয় এই ঘটনার এক স্থায়ী প্রভাব মালয়েশিয়ান কুইজিনে বিদ্যমান। এরপর একে একে পর্তুগীজ, ডাচ ও ব্রিটিশরা আসে মেইনলি মসলার খোঁজে সাথে মালয়েশিয়ানদের পরিচয় করিয়ে দেয় পিনাট, আনারস, এভোকেডো, টমেটো, স্কোয়াস ও মিষ্টি কুমড়ার সাথে। এরপর ঊনিশ 

শতকে ব্রিটিশ শাসকরা প্রচুর ইন্ডিয়ান ও চাইনীজদের নিয়ে আসে রাবার এস্টেট আর টিন মাইনে কাজ করার জন্য [১]। এসব কারণে মালয়েশিয়ান কুইজিন হলো মালয়, চাইনীজ, ইন্ডিয়ান এর মিশ্রণ; সাথে কিছুটা থাই, পর্তুগীজ, আরব, এবং ব্রিটিশ কুইজিনের প্রভাব।

মালয়েশিয়ান কুইজিনে কয়েকটা বৈশিষ্ট্য হলোঃ ১) মালয়েশিয়ান খাবারে অনেক রকম হার্বস আর মসলার ব্যবহারের কারণে তা অনেক ঝাঁজালো ২) নারকেলের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায় এদের খাবারে ৩) এরা মাছ থেকে শুরু করে পাকা কলা অনেক কিছুই ডুবো তেলে ভেজে খায় ৪) মালয়েশিয়ানরা অনেক ধরনের পানীয় খায় যা খুবই মিষ্টি থাকে ( এর ফলাফল হলো এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশী ডায়াবেটিসের হার মালয়েশিয়াতে)। মালয়েশিয়াতে যেকোন মেইন ডিশে প্রধান উপাদান হলো ভাত। আপনি সকালে নাস্তা খেতে রেষ্টুরেন্টে গেলে দেখবেন যে ভাতের আইটেম আছে। এদের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় খাবার নাসি লেমাক (Nasi Lemak) যা প্রধানত সকালের নাস্তায় খাওয়া হয়। ইদানীং অবশ্য এর পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে অর্থাৎ অন্য সময়েও নাসি লেমাক খাওয়া হয়।


নাসি লেমাকে ভাত রান্না করা হয় নারকেল দুধ ও পানডান পাতা দিয়ে; আর একে পরিবেশন করা হয় আয়াম মানে মুরগী (ফ্রাই বা কারি), ডিম সিদ্ধ, সাম্বাল, আর বাদাম ও শ্যুটকি ভাজা দিয়ে। এখন পর্যন্ত খাওয়া নাসি লেমাকের মধ্যে সবচেয়ে মজার ছিলো বুকিত বিনতাং এর প্যাভিলিয়ন মার্কেটের ফুড কোর্টে খাওয়া নাসি লেমাক। আরেকটা জনপ্রিয় খাবার হলো নাসি গোরেং (Nasi goreng) যা ইন্দোনেশিয়াতেও অনেক প্রচলিত ও জনপ্রিয়। নাসি গোরেং অনেক ধরনের আছে আর এর নামগুলোও অনেক মজার যেমনঃ নাসি গোরেং চায়না (একদম স্পাইস ছাড়া), নাসি গোরেং ইউএসএ (ডিম ও বিফ সহ), নাসি গোরেং আয়াম (মুরগী সহ), নাসি গোরেং পাতায়া (ফ্রাইড রাইসকে অমলেটের ভাজে পরিবেশন করে), নাসি গোরেং কামপুং (শ্যুটকি সহ) ইত্যাদি।


মালয়েশিয়াতে জনপ্রিয় চায়ের নাম হলো তেহ তেরিক (TehTerik) যা কন্ডেন্সড মিল্ক দিয়ে বানানো হয়। মালয়েশিয়াতে আমাদের প্রিয় এক পানীয় হলো আসাম লিমাও বয় (Asam Limau Boi) যা তৈরি হয় চিনি, লেবু আর শুকনো Plum দিয়ে। টক মিষ্টি স্বাদের এই পানীয় আমরা পুরা ফ্যামিলি অনেক মজা করে খাই।

 মালয়েশিয়ার আরেকটা খাবার যার কথা এইখানে না বললেই না তা হলো রোটি চানাই (Roti canai)। এই লেয়ারড পরোটা বানানোর একটা বিশেষ পদ্ধতি আছে আর তা হলো হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বানানো হয়। অনেক জায়গার রোটি চানাই খাওয়া হলেও আমার কাছে পেরাকের UTP ইউনিভার্সিটির ক্যান্টিনে বানানো রোটি চানাই সবচেয়ে বেশী মজা লেগেছে।

মালয়েশিয়াতে আরও অনেক অনেক ধরনের খাবার বিদ্যমান যা নিয়ে কথা বলতে গেলে শেষ হবেনা।




[১] https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S2352618117301737#bib5


***এই সাইটের লেখার কপিরাইট মডেস্ট কালেকশন এর। লেখা আপনি অবশ্যই শেয়ার করতে পারেন, সেটা আমাদের সাইট থেকে লিংক শেয়ারের মাধ্যমে। কিন্তু কপি পেস্ট করে নিজের প্রোফাইল বা পেইজে দেয়ার অনুমতি আমরা দিচ্ছিনা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।