সাফসুতরা ম্যানুয়াল সমিপে

মনোরম বিকেলে গতকাল হাওয়া খেতে বারান্দায় গিয়ে দেখি উপর তলার বাসিন্দা 

ঝপঝপিয়ে ময়লা পানি ফেলছে টরন্টো শহরের রাস্তায় এবং আংশিক আমার বারান্দায়। 

এটা তাঁদের নতুন কাহিনী নয়। আলতো নম্র ভাবে আগেও সুপারভাইযর দ্বারা মানা 

করা হয়েছে। তাই কালকে মোটামুটি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আকাশ পানে মুখ তুলে 

চেঁচিয়ে উঠলাম, অ্যাই, তোমার ময়লা পানি ফেলা বন্ধ কর, এক্ষুনি, এক্ষুনি!


চেঁচামেচিতে কাজ হল, নাম-পরিচয় না জানা ব্যাক্তি তাৎক্ষনিক আমার বারান্দায় 

ময়লা পানি পাচার করা থামালেন। ভার্সিটির এক লেকচারারের কথা মনে পড়ল, উনি 

বলতেন যে আমরা জাতি হিসেবে খুব মিনমিনে, মানে, অন্যদের সাথে। নিজেদের মাঝে,

 নিজেদের দেশে আবার মেনি বিড়ালও বাঘ। গায়ে গায়ে টোকাটুকি হলেই ‘খাইসি তোরে’

 ব্যাপার স্যাপার। কথা অনেকটাই সত্য। এর মাঝেও কাহিনী আছে। দেশের বাইরে 

আসলে চাইনিজরা চাইনিজদের ব্যাপক সহযোগিতা করবে সব ক্ষেত্রে- চাইনিজ মাছ 

বিক্রেতা হলে চাইনিজ ক্রেতা দেখলে পারলে এক মাছের দুটো মাথা দিয়ে দেয়, 

ইন্ডিয়ানরা ইন্ডিয়ানদের জন্য জান দিয়ে দিবে, এক ল্যাটিনো আরেক ল্যাটিনোকে 

দেখলে জড়ায় ধরবে, কিন্তু আমরা বাঙ্গালীরা বাঙ্গালীদেরকে ভালো পাই না।


সেদিন দেখি এক গ্রুপে একজন জানতে চেয়েছে সে অন্য শহর থেকে টরন্টো আসছে, 

সকালের নাস্তা কোন বাংলাদেশী দোকানে করলে ভালো হয়। সঙ্গে সঙ্গে আরেক 

বাঙ্গালী উত্তর দিয়েছে, এখন তুমি ক্যানাডায়, ক্যানাডিয়ান ব্রেকফাস্ট ট্রাই 

কর! অথচ প্রশ্নকর্তা বহু বছর ধরে এ দেশে আছেন। আরেক আপু একবার লিখেছেন যে 

যেসব বাঙ্গালি এখানে বাড়ি করছেন, টয়লেটে হ্যান্ড শাওারের ব্যাবস্থা করলে 

ভালো হয়। মুহূর্তের মাঝে কয়েকজনের জবাব আসল, দেশীয় কায়দায় মল সাফ করতে 

চাইলে দেশে ফেরত যান গিয়া! একজন দেখলাম আরেক কাঠি সরেস, লিখেছে, যে দেশে যে

 নিয়ম; এখানে থাকলে এখানকার সাফসুতরা হওয়ার নিয়ম পালন করতে হবে। লিখতে 

চেয়েছিলাম, ভাইজান, এখানকার সাফসুতরা হওয়ার উপর একটা ম্যানুয়াল দিলে উপকৃত 

হই। বহু কষ্টে নিজেকে আটকিয়েছি।


কালকে এক বন্ধু বলছিল আমাদের দেশে যারা ভালো ইংলিশ পারে তারা অন্যদের 

তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকে সাধারনত। যদিও আমি কথাটার সাথে পুরোপুরি একমত নই, 

তারপরেও বহু বছর শিক্ষকতার সাথে সম্পৃক্ত থাকায় দেখেছি আমরা অল্প একটু 

ইংলিশ শিখলেই ভীষন এক বিভীষিকাময় একসেন্ট ধার করে সামিয়া নামকে সোমিয়া আর 

কমার্সকে কোমার্স আর ড্যামকে ডেইইম বানিয়ে ফেলি। তবে এ কথা ঠিক, যে কোন 

অফিশিয়াল, আনঅফিসিয়াল কাজে ইংলিশ ম্যাজিকের মতন কাজ দেয়। ভার্সিটি জীবনে 

বহুবার এমন হয়েছে ফ্যাকাল্টি এহলান দিয়েছে যে শাড়ি না পরলে প্রেজেন্টেশনে 

মার্কস কাটা যাবে। আমি কিন্তু যথারীতি আবায়া পরেই ডায়াসে গিয়েছি, সাবলীল 

ভাবে প্রেজেন্টেশন দিয়েছি। তাঁরা কথা রাখে নি, শাড়ি না পরার জন্য আমার এক 

মার্কও কখনো কাটা যায় নি, কাটলে আমি কিছু মনে করতাম না। আমি বাইলিঙ্গুয়াল, 

দ্বিভাষিক যাকে বলে। আমার জন্য বাংলা, ইংলিশ দুটাই নেটিভ। সমানতালে খটমটে 

বাংলা ইংলিশ বই পড়তে পারি, একসেন্ট ছাড়াই কথা বলতে পারি। কোন ভাষার উপর 

আমার দাখিল অবশ্যই আমার জন্য সম্পদ, তবে তা আমার বুদ্ধিমত্তার মাপকাঠি না। 

এখানেও অনেক সময় এরকম হয়, কিছু বাঙ্গালী দোকানে গেলে তাঁরা 

সাদা-সোনালী-হলুদদের দিকে তাকিয়ে ঠিকই হাসবে, শুভেচ্ছা বিনিময় করবে, কিন্তু

 আমার মতন ভাত ডাল খাওয়া মানুষ গেলে নিমতেতো মুখে তাকিয়ে থাকবে। মাঝে মাঝে 

ভাবি, রেসিযম, অর্থাৎ স্বাজাতিকতায় অন্য জাতিরা ধরাকে সরা জ্ঞান করলেও আমরা

 বহু ডিগ্রী এগিয়ে আছি তাঁদের চেয়ে। আমরা স্বীয় জাতির প্রতিই রেসিস্ট! এমন 

শুনেছে কোথাও কেউ? ভাবি, এদের জন্য আসলেই একটা সাফসুতরার ম্যানুয়াল তৈরি 

করব, নাম দিব, হান্ড্রেড ওয়েইস টু ক্লিন ইউরসেলফ অফফ দা আর্থ, 

পারমানেন্টলি!


 


***এই সাইটের লেখার কপিরাইট মডেস্ট কালেকশন এর। লেখা আপনি অবশ্যই শেয়ার করতে পারেন, সেটা আমাদের সাইট থেকে লিংক শেয়ারের মাধ্যমে। কিন্তু কপি পেস্ট করে নিজের প্রোফাইল বা পেইজে দেয়ার অনুমতি আমরা দিচ্ছিনা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।