আজীবনের-বন্ধু-‘বই’

                

বই পড়ার অভ্যাসকে আমি অন্যান্য চিত্তবিনোদনমূলক অভ্যাসের মতো ‘অবসরের সঙ্গী’ বলতে নারাজ। কারণ সত্যিকার অর্থে এই অভ্যাস যাদের আছে তারা অবসরে বই পড়ে না বরং বই পড়ার জন্য সময় নির্ধারন করে রাখে। সেই সাথে, বই শুধুই বিনোদনের খোরাক যোগায় না, এটা একজন মানুষকে একাধিকভাবে উপকৃত করতে পারে। নিজের জীবনে এর প্রমাণ পেয়েছি বলেই আজ এই লেখা লিখতে বসলাম।

বাঙ্গালী নাকি “বই-রাগী” জাতি। কথাটা বড় হয়ে শুনেছি। মানুষের সাথে মিশে আস্তে আস্তে দেখেছি অনেকটা তা-ই। কিন্তু আল্লাহর রহমতে নিজের পরিবার থেকে এর উল্টোটাই পেয়েছি। আমার নানীর ছিল বা বলা যায় আছে এই অভ্যাস। যেখানে যা পেতেন পড়ে ফেলতেন। বয়সের কারণে চোখের জ্যোতি কমে যাওয়ায় পড়তে কষ্ট হতো, তবুও পড়তেন। সংসারের মাঝে থেকে পড়েছেন, সংসার ধর্ম ছেড়ে দেয়ার পরও পড়েছেন। স্বামী ইন্তেকাল করলেন, তারপরও পড়ার অভ্যাসের মাঝে দিনানিপাত করেছেন। ফলে কী হোল, একাকীত্ব গ্রাস করতে পারলোনা উনাকে, নিজের একটা জগত নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারলেন, টিপিক্যাল শাশুড়িদের মতো ছেলের বউদের দোষ ত্রুটির পেছনে পরে রইলেন না।নানীর থেকে আমার আম্মু পেয়েছে এই অভ্যাস। অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে আব্বুর সাথে রাবার বাগানের নিরিবিলি পরিবেশে চলে গিয়েছিলেন। একাকী ওই সময়ে বই পড়তেন, ব্যস্ত সংসার জীবনেও পড়তেন। এখন যখন আবার ছেলেমেয়েরা যে যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তখন বিভিন্ন বই, আর্টিকেল, পত্রিকা আম্মুর দৈনন্দিন জীবনের অংশ।আমার নিজের কথা যদি বলি, অস্বীকার করব না যে একটা সময় ছাঁইপাশ বই পরেই কাটিয়েছি। সেসব পড়ে লাভের মাঝে যা হয়েছে বলে আমি মনে করি, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া সত্বেও বাংলায় লেখার মতো জ্ঞানটুকু আছে আলহামদুলিল্লাহ্‌। তবে আল্লাহ্‌ ‘বুঝ’ দেয়ার পর থেকে উপকারী বই পড়তেই চেষ্টা করেছি। আর এখন তো পড়া শুধুই মলাটবন্দী বইয়ের মাঝে আটকে নেই। ই-বুক থেকে শুরু করে আর্টিকেল, গল্প, খবর, অ্যাপ সবই তো ডিজিটাল হয়ে গেছে। তবে এসব পড়ার ভিত্তিও সেই বই পড়ার অভ্যাসটাই।বিয়ের পর বরের সাথে যখন নিউযিল্যান্ডে গেলাম, আমরা যে শহরে ছিলাম সেটা ছিল ছোট একটা শহর। বাঙ্গালী বা মুসলিমরা থাকত দূরে দূরে। কাছে থাকলেও মানুষের ব্যস্ততা থাকত, সবার সাথে সবার সময় মেলেনা যে নিজের সুবিধামতো সময়ে গিয়ে বসে দুটো কথা বলা যাবে। বিদেশ জীবন বড় নিঃসঙ্গ জীবন, যে তা কাটায়নি তাকে বোঝানো কঠিন! তখন আমার রুটিনের মাঝে ছিল ইসলামিক অনলাইন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সগুলো। একসময় মেয়ে হোল, কোর্সের সংখ্যা কমলো। এরপর আবার দ্বিতীয় বাবু পেটে আসল, ডেডলাইন মেইনটেইন করে কোর্স নেয়া কঠিন হয়ে গেল। সেমিস্টার ড্রপ করলাম। কিন্তু পড়া থেমে থাকেনি। এই সময়ই পড়েছি আমার জীবনের অন্যতম উপকারী বই; ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাকৃতিক প্রসব ছিল যেটার বিষয়। এই বই থেকে পাওয়া জ্ঞানের আলোকে আমার দ্বিতীয় প্রসব হয়ে থাকবে জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা,আলহামদুলিল্লাহ্‌।

উপরে আমাদের তিন প্রজন্মের জীবনে পড়ার অভ্যাসের ভূমিকা নিয়ে সংক্ষেপে কিছু কথা বললাম। নিজের ও কাছের এই মানুষদের, সেই সাথে যাদের এই অভ্যাসটা নেই তাদের দেখেও বুঝেছি, বই পড়ার অভ্যাস কোনভাবেই শুধু বিনোদনমূলক বিষয় না।এটা একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকেও প্রভাবিত করে। দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আনে, যেখানে অযথা সময় নষ্ট করার সুযোগ কমে যায়। একঘেয়েমি এসে ভর করতে পারে কম, একাকীত্ব গ্রাস করতে পারে না, বিষণ্ণতা স্থায়ী হতে পারে না। সবাই দূরে চলে গেলেও, যার যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেলেও বই সঙ্গী হিসাবে থেকেই যায় সবসময়। বই জীবনে লক্ষ্য নির্ধারণ করেও দেয় কারণ একটা বই শেষ করে আরেকটা পড়ার তাড়না থাকে। এসব ছোট ছোট লক্ষ্য নিয়েই জীবন হয়ে ওঠে উদ্দেশ্যপূর্ণ।এই উপলব্ধি থেকেই সবসময় চেয়েছি আমার সন্তানদের মাঝে এই সুঅভ্যাসটার ভিত্তি গড়ে দিতে। পশ্চিমারা ছোট থেকেই বই পড়াকে উৎসাহিত করে। তাই বিদেশে কাপড়ের বই, হার্ড পেপারের ছোটদের বই পেতে অসুবিধা হয়নি। দেশে চলে আসার পরও চেষ্টা করে যাচ্ছি বিভিন্ন আকারের, ভাষার, মাধ্যমের (প্লাস্টিক, পাতলা কাগজ, মোটা কাগজের) বই কিনে দেয়ার। ওয়াল্লাহি, আমি এর উপকার ছাড়া কোন ক্ষতি দেখিনি। তবে আমি নিশ্চিত করে চেষ্টা করি বইয়ের কন্টেন্ট যেন ওদের উপযোগী হয়। আমার বাচ্চারা বইকে তাদের একরকম খেলনাই মনে করে আলহামদুলিল্লাহ্‌। এই বয়সে তাদের যে অভিজ্ঞতা হওয়ার কথা তার বাইরেও অনেক কিছু বইয়ের পাতা থেকে শিখে যাচ্ছে। বই নিয়ে নাড়াচাড়া করা সুস্থ বিনোদনের বিকল্পহীন মাধ্যম আর ভবিষ্যতে সুস্থ-সুন্দর জীবনের বুনিয়াদ ইনশাল্লাহ। বাংলাদেশের মানুষ কিছুটা অবাকই হয় ওদের বই নিয়ে নাড়াচাড়া করা দেখে আবার এমনও মনে করে আমি বাচ্চাদের পড়াশোনা করাচ্ছি। কিন্তু আমার নিয়ত ওদের বইয়ের সাথে সখ্য গড়ে দেয়া। ওরা বইকে ভালবাসুক, বই নিয়ে জীবন কাটাক, বই ওদের আজীবনের সঙ্গী হোক।বই পড়ার মতো একটা সুঅভ্যাস যে একজন মানুষকে কতরকম অনাকাঙ্ক্ষিত 

পরিস্থিতি, অভিজ্ঞতা থেকে সরিয়ে রেখে ফলপ্রসূ জীবন যাপন করতে সাহায্য করে তা সবাইকে জানানোর একটা প্রয়াস এই লেখা। কারো উপকারে আসলে আমার জন্য দু’আ করবেন।


লেখিকার আরো কিছু লেখা https://www.modestbd.com/blog/exercise-for-moms


Disclaimer: সমস্ত আর্টিকেল এর স্বত্তাধিকার মডেস্ট কালেকশন এর। এই সাইট থেকে কপি পেস্ট করে নিজের প্রোফাইল বা পেইজে দেয়ার অনুমতি আমরা দিচ্ছিনা। আপনি অবশ্যই লেখাটা শেয়ার করতে পারেন আমাদের ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি লিংক শেয়ার করে। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।