Parenting

আমার আদিয়ান ও তার এডিএইচডি-২য় পর্ব

আমার আদিয়ান ও তার এডিএইচডি-২য় পর্ব

আমার আদিয়ান ও তার এডিএইচডি


ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘ ৫৫দিন হসপিটালে থাকতে হয়েছিল. রোজ ভোরবেলা আমার হাসব্যান্ডের সাথে চলে যেতাম হসপিটালে. আমাকে নামিয়ে দিয়ে তিনি কাজে চলে যেতেন আর বিকালে আমাকে আবার নিয়ে ফিরে আসতেন। আমি রোজ আদিয়ানের একটু একটু বড় হওয়া দেখতে লাগতাম। নার্সরা আমাকে প্রথম কয়দিন খুব বকা দিত! কেন আমি রোজ যাই? আমি তো শুধু ব্রেস্টমিল্ক টা ফ্রিজারবক্সে করে পাঠিয়ে দিলেই তো পারি? তা না করে আমি যে যাচ্ছি তাতে তো আমার পোস্ট প্রেগন্যান্সির প্রপার রেস্ট হচ্ছেনা। আমি খুব ভালোভাবেই তাদের বুঝিয়েছিলাম আমার কোন অসুবিধা হচ্ছেনা। ওয়েটিং লাউন্জে আমার খুব ভালোভাবেই সময় কেটে যাচ্ছে। তারা হাল ছেড়ে দিয়ে পরে আমাকে ওয়েটিং লাউঞ্জের পাশেই ছোট্ট একটা বেডরুম দিয়ে দিয়েছিল যেন আমার রেস্ট টা প্রপার হয়। সুবহানআল্লাহ্.. কি যে যত্ন পেয়েছি তাদের! তাদের জন্য আমার হেদায়েতের দুয়া রইল। এই প্রিম্যাচিউরিটির স্টেজটায় আমার জন্য সবচেয়ে কস্টের সময় ছিল আদিয়ানের রিফ্লাক্স প্রবলেম আর বমি; যেহেতু অন্ননালি টা সম্পুর্ন রুপে তৈরী হয়ে উঠেনি তাই যাই খেত তা উপরে উঠে আসতো বমিরুপে। অনেক সময় যা দুধ খেত তার চেয়ে প্রায় ৩গুন বেশি বমি করতো! এভাবে এত ছোট্ট দেহটায় একদম কোন শক্তি থাকতো না আর এক সময় নার্সরা তাকে ক্যাফেইন(কফি) দিতে শুরু করলো দুবেলা করে। এটাতে আদিয়ানের নাকি কিছুটা শক্তি হবে। ঐসময়ের আগে এমন আশ্চর্য কথা কখনো শুনিনি। তবে হ্যা, সত্যিই রেজাল্ট দেখতে পাচ্ছিলাম,আলহামদুলিল্লাহ্। এভাবে বিভিন্ন স্টেজ পার হয়ে ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফেরার দিন ঘনিয়ে আসলো। হসপিটাল অথোরিটি খুব সুন্দর করে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কখন কি হলে কি করতে হবে, কোন ডিপার্টমেন্টে যোগাযোগ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বারবার ৩টা কথা বলে দিয়েছিলেন পই পই করে

১) যেহেতু সে প্রিম্যাচিউর অবশ্যই ওর যেকোন ডেভেলপমেন্ট অন্য বাচ্চার তুলনায় একটু দেরীতে হবে; তাতে যেন ভয় না পাই।

২) অবশ্যই যেন তার মাল্টিভিটামিন এবং আয়রনের সাপ্লিমেন্ট যেন দীর্ঘ ৯ মাস পর্যন্ত কন্টিনিউ করি এবং আমি নিজেও যেন ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট ততদিন পর্যন্ত চালিয়ে নিই. যেহেতু সে ব্রেস্টমিল্ক খাবে।

৩) কখনোই কোন ভ্যাক্সিনেশন দিতে যেন দেরি না করি।

এরপর দু/একজন নার্স বিশেষ একটা কথা আমাকে বারবার বলেছিল... বলেছিল,তুমি হয়তো জানোনা প্রিম্যাচিউরড ব‍াচ্চারা অনেক বেশি স্মার্ট আর বুদ্ধিদীপ্ত সমপন্ন হয়। তুমি শুধু ভালো করে ওর যত্ন নিও। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাড়ি ফিরলাম। আর সবকিছু সেভাবেই চলতে থাকলো যা যেভাবে পরামর্শ পেয়েছিলাম। অন্যান্য মায়েদের মতোই আমার প্রবাস জীবনে সংসার সামলে একাকী দিন কাটতে লাগলো; আর ছেলেকে নিয়ে নির্ঘুম রাত। সে কিছুতেই রাতে ঘুমাতো না। আর বমি তো ছিলই; আমি মুলতো বমির ভয়েই আরো ঘুমাতে পারতাম না। এত বেশি বমি হতো যে ছোট্ট শরীর টা পুরো ভিজে চুপসে থাকতো।

আস্তে আস্তে আদিয়ান বড় হতে লাগলো। বসতে শিখলো সাড়ে নয় মাসে, দাত উঠলো তের মাসে, আর হাটা শিখলো অলমোস্ট সতের মাসের দিকে। সবকিছুর জন্য অপেক্ষা থাকতো কিন্তু ভয় পাইনি আলহামদুলিল্লাহ্. বুঝে গিয়েছিলাম যে আসলেই ওর সবকিছু দেরিতে হবে। এমনি করে দিন যেতে লাগলো। বাবা যেহেতু বাইরে কাজ করে মা ছাড়া তো কাউকে পায়না; তাই আমিও আইপ্যাড দিয়ে রাখতাম যখন আমি ব্যস্ত থাকতাম সংসারের কাজে। সেটাতেই সে বিভিন্ন কার্টুন দেখতো, ছবি দেখতো, অ্যালফাবেট আর নাম্বার্স গুলো চিনতে শিখেছিল। সবচেয়ে প্রিয় ছিল হট হুইলসের গাড়ি গুলো। যেখানে একটা বাচ্চার প্রথম শব্দ থাকে মা/ বাবা ইত্যাদি সেখানে আদিয়ানের প্রথম কথা ছিল "এতাম ব্রুম" মানে গাড়ি। দিন যায় মাস যায়... বুঝতে পারি ছেলেটা মনে হয় একটু একা থাকতেই বেশি পছন্দ করছে। গেস্ট আসলে খুশি হয় কিন্তু একটু পর পর আবার নিজের কাজেই বা নিজের খেলায় মেতে উঠছে। খুব করে বলছি হয়তো একটা কিছুর প্রতি মনযোগ দিতে সে শুনলো কিন্তু মনে হচ্ছিল গা করছে না। খুব মেজাজ খারাপ হতো আমার; বকাও দিতাম/ কিছু ক্ষেত্রে পিটুনিও; কাজ হতোনা। খারাপ লাগতো, আবার পরে আদর ও করতাম। আর খালি মনে মনে বলতাম.. কেন এমন করিস বাবা? কেন বুঝিস না মা কি বলছি ? ডাকতে ডাকতে বা কিছু বলতে বলতে কাহিল হয়ে যেতাম। কোন কথাই যেন কানে যায়না। সব কিছু খালি ইগনোর করে। বা মনে হতো ভুলে গেল কেন?? দেখতে দেখতে এভাবে ৫ বছর কেটে গেল.. সময় হলো আদিয়ান কে স্কুলে ভর্তি করার, আর আমার জন্য সময় হলো জীবনের আরেকটা কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হবার...


চলবে.... 


প্রথম পর্বের লিংক https://www.modestbd.com/blog/life-with-adhd-attention-deficit-hyperactivity-disorder



***এই সাইটের লেখার কপিরাইট মডেস্ট কালেকশন এর। লেখা আপনি অবশ্যই শেয়ার করতে পারেন, সেটা আমাদের সাইট থেকে লিংক শেয়ারের মাধ্যমে। কিন্তু কপি পেস্ট করে নিজের প্রোফাইল বা পেইজে দেয়ার অনুমতি আমরা দিচ্ছিনা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।