Parenting

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি (৩য় পর্ব)

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি (৩য় পর্ব)

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি


আমরা যেহেতু সিডনি, অস্ট্রেলিয়া তে থাকি বলাই বাহুল্য এমন একটা ননমুসলিম সমাজে বসবাস করছিলাম যেখানে আশে পাশে পরিচিত বন্ধু বান্ধব বাঙালি আর মুসলিম হলেও বাচ্চাদের স্কুলের ব্যাপার টা সম্পুর্ন ভিন্নই হবে। একটা বড় ভালো স্কুল মানে এখানে অবশ্যই সেটা মাল্টি কালচারাল আর বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বাচ্চারা পড়াশুনা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যারা মোটামোটি ভাবে হলেও আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির আশা রাখি আর একটু হলেও ভয়ে থাকি তারা অবশ্যই এই স্কুল গুলোতে বাচ্চাকে এডমিশন করানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত চিন্তিত থাকি। আমি কিন্তু মোটেও বলছিনা এখানে পড়াশুনা ভালো হয়না, মা বাবা খারাপ এদের, ননমুসলিম মানেই ভালোনা ব্লা ব্লা ইত্যাদি কোনভাবেই বলছিনা এগুলো প্লিজ। আমি শুধু বলছি এদের কিছু সামাজিক রীতিনীতি থাকে যা কিনা আমাদের পক্ষে মেইন্টেইন করা সম্ভব না। যেমন ধরুন:আদিয়ানের বয়স সামনের ফেব্রুয়ারি তে ১১ হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত আমরা বা ও নিজে কোনদিন জন্মদিন পালনের কথা বলেনি। গিফট পেলে খুশি হয়েছে, কিন্তু কেক কাটতেই হবে, ক্যান্ডেল নিভাতে হবে এমন কিছু আলহামদুলিল্লাহ্ আদিয়ান এখনো বলেনা। আশা রাখি ইনশাআল্লাহ্ কোনদিন বলবেওনা। কিন্তু আমি যদি একটা লোকাল স্কুলে ওকে ভর্তি করি তাহলে আমাকে এই দিনটা অবশ্যই সেলিব্রেট করতে হবে অন্তত ব‍াচ্চাদের জন্য কাপকেক বা ছোট খাট পার্টি ব্যাগ পাঠিয়ে। এমন অনেক ছোট খাট উদাহরন আছে যা আর উল্লেখ করছিনা, ওগুলোর জন্যই ছেলের তিন বছর বয়স থেকে বাবা মা হিসেবে দুজনই খুজতে লাগলাম ভালো ইসলামিক স্কুল কোথায় কোথায় আছে? আলহামদুলিল্লাহ্ নাগালেই পেলাম কিছু এবং এগুলোর মধ্যে অনেক গুলোর একাডেমিক স্কোর ও বেশ ভালো. খুজে খুজে ৩/৪ স্কুলের এডমিশন ফর্ম নিয়ে আসলাম আর আদিয়ান কে তৈরি করতে শুরু করলাম।

(এখানে অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে, কিন্তু একটা কথা বলা জরুরি মনে করছি. আমি আমার ছেলেকে ভর্তি করাতে গিয়ে বুঝতে পারলাম ব‍ংলাদেশে কি পরিমান অস্বাস্থ্যকর পড়াশুনা হয়। পুরো এডুকেশনাল সিস্টেমে যে কি পরিমান গলদ তা তখন ই প্রথম বুঝেছিলাম। প্লে-গ্রুপ নার্সারির কি পরিমান ভুল সংগা আমাদের দেশের সমাজে প্রচলিত তা বলার অপেক্ষা রাখছেনা। এটা নিয়ে ইসলামিক/ননইসলামিক স্কুল গুলো যেগুলো ভালো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য খাটছেন তারা আসলেই খাটুন। সবার আগে ছোট বাচ্চাদের(০-৫) বছর টা নিয়ে কাজ করে তারপর স্কুলের জন্য রেডি করুন। এটা নিয়ে ও আপনাদের কে কিছু ইনফরমেশন দেওয়ার ইচ্ছা যা আমার ধুলিকনা সমপরিমান জ্ঞানে আছে সেটা অন্য কোন লেখায় ইনশাআল্লাহ্)

যাই হোক... আদিয়ান কে পড়তে বসানো মানে ছিল বিশাল হ্যাপা। আল্লাহ্ রে... কিছুতেই তো ছেলেকে মনোযোগে আনতে পারিনা! সে কার্টুনে বা লার্নিং ভিডিও গুলোতে যত খুশি মনেই এ বি সি ডি শিখুক না কেন যতই ওয়ান টু জানুক আর গুনতে পারুক না কেন খাতা কলমে তো সে কিছুতেই আগ্রহী না। এমন কি ৫ মিনিট ও বসে না। স্কুল ভর্তির রিকোয়ারমেন্ট অবশ্য তেমন কিছু না; কালারস,শেইপ, নাম্বার ১-২০ আর আপার কেইস লোয়ার কেইস এ বিসিডি গুলো জানতে হবে। খুব ভালো ভাবে নিজের নামটা লিখতে পারতে হবে। সম্ভব হলে ছোট সুরা ২/৩টা আর কালেমা টা জানতে হবে। আর এ সব কিছু ভালভাবে বুঝাতে পারলেই আশা করা যায় আদিয়ান সহজ ভাবে একটা ইসলামিক স্কুলে ভর্তি হতে পারবে। সব ই সে পারতো আলহামদুলিল্লাহ্. কিন্তু খেয়াল করলাম, যখনই Adyan নামটা লিখতে যাচ্ছে , অক্ষর বসানোর যায়গা টা আর মোটেও সুন্দর থাকছেনা। ওরে আল্লাহ্... এক একটা অক্ষর এক একটা ভিন্ন ভিন্ন সাইজের আর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে বসছে; কিছুতেই এটা ঠিক করতে পারছিলাম না। খালি বুঝাচ্ছিলাম আর ছেলে খালি মাইর খাচ্ছিল। আমার টেনশন ছিল এমন করলে তো চান্স পাবেনা স্কুলে! ছেলের বাবার কথা হলো.. জানোই তো, ওর সব কিছুতে একটু সময় লাগবে। অস্থির হলে চলবে?! আমরা না হয় ওর ছয় বছর বয়সে ওকে স্কুলে দিই। আমি আবার সেটা মানতে পারছিলাম না! আমার মনে হচ্ছিল বিনা কারনে একটা বছর শুধু শুধু নস্ট করবো? কেন? ও তো পারছে। যাই হোক... হাতের লেখার ওই অবস্থা নিয়েই আমরা ৪টা স্কুলের এডমিশনের দিনক্ষন অনুযায়ি অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রথম যেই স্কুলটায় এডমিশন টেস্টের জন্য গেলাম সেটা তে গিয়ে ছেলে একদম চুপ। এমন চুপ ই হলো... কোন বোমা মেরেও যেন তার মুখ দিয়ে কথা বের হলোনা। ভয়ে চিমসে গেল। আমিও আর কিছু বল্লাম না। খুব রেগে গিয়েছিলাম; কিন্তু কিছু করার ও ছিলনা। এমন করে সে বাকি ৩টা স্কুলে পরীক্ষা দিল কিন্তু কোনটা তেই আমরা প্যারেন্ট রা আর সামনে ছিলাম না; তাই ধরেই নিয়েছিলাম আদিয়ান কোথাও কিছু বলতে পারেনি আর টেস্ট ও ভালো হয়নি আর সে চান্স ও পাবেনা। মন খারাপ করে বিকল্প কি করা যায়, যেই না ভাবছি সে রকম পরপর ৪টি বিকেলে ৪টি স্কুলের চিঠি এলো। ১টা তে সরি বলে, আর বাকি ৩টায় কনগ্রাচুলেশনস বলে। ছেলে আসলেই তখন বাকি ৩টি স্কুলে চান্স পেয়েছিল, আলহামদুলিল্লাহ্... এত্ত খুশি মনে হয় তখন আর কোন বিষয়েই হতে পারিনি! ৩টাতে চান্স পাওয়ায় এরপর ভাবনা বেরে গেল, কোনটায় ভর্তি করবো?! ভেবে চিন্তে তখন অন্য এরিয়ায় স্কুলে ভর্তি করলাম। ভর্তি করলাম আল-ফয়সাল কলেজ মিন্টো'র শাখায়।

আমাদের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ একটি অধ্যায় শুরু হলো। এখন শুধু ছেলেকে ভালোভাবে পড়িয়ে লিখিয়ে ভালো ভাবে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে বড় করে তোলার পালা.. বা আরো মজা করে যদি বলতে যাই, প্রতিদিন আমার নতুন নতুন ধাক্কা খাওয়ার পালা....যতটা সহজ হবে সন্তান পালন তা যে আসলে হবার নয়... তা টের পাচ্ছিলাম হাড়ে হাড়ে...


চলবে... 


প্রথম পর্বের লিংক https://www.modestbd.com/blog/life-with-adhd-attention-deficit-hyperactivity-disorder



***এই সাইটের লেখার কপিরাইট মডেস্ট কালেকশন এর। লেখা আপনি অবশ্যই শেয়ার করতে পারেন, সেটা আমাদের সাইট থেকে লিংক শেয়ারের মাধ্যমে। কিন্তু কপি পেস্ট করে নিজের প্রোফাইল বা পেইজে দেয়ার অনুমতি আমরা দিচ্ছিনা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।