Parenting

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি (৪র্থ পর্ব)

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি (৪র্থ পর্ব)

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি


আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে আমরা মিন্টো তে ভালো একটা বাসা পেয়ে গেলাম ছেলের স্কুল শুরু হবার আগেই। সমস্ত ফরমালিটিজ শেষ করেছি। নতুন স্কুল ইউনিফর্ম ,বই খাতা , স্কুল ব্যাগ সব রেডি। দিন গুনছি, খুবই চাপা টাইপের অস্থির লাগছে। আগে আদিয়ান প্রিস্কুলে গিয়েছে তবে তা শুধু সপ্তাহে দুইদিনের জন্য। এখন যাবে ৫দিন, ৭ ঘন্টা রোজ... ছেলেটা কেমন করবে আল্লাহই জানে। মা হিসেবে সবচেয়ে বেশি অস্থির লেগেছে এই ভেবে ঠিকমতো খাবে কিনা? কারন তখন ও ওকে ভাত টা খাওয়ায় দিতে হতো। প্রথম সন্তান প্রথম স্কুলে যাবে কত ধরনের মিশ্র অনুভূতি হতে পারে বোধহয় সবাই বুঝতে পারছেন।

স্কুল শুরু হবার ১সপ্তাহ ভালো ভাবেই গেল। তারপর থেকে ছেলে আর যেতে চায়না। কারন, লম্বা সময় থাকতে হচ্ছে, অনেক লেখা লেখি করতে হচ্ছে, অনেক টাইপ এক্টিভিটিজে অংশ গ্রহন করতে হচ্ছে যার কোন কিছুই আদিয়ান পছন্দ করছেনা। রোজ পকেটে করে একটা ছোট্ট গাড়ি নিয়ে যায়। টিচার রা প্রথম ২/৩টা সপ্তাহ পারমিশন দিয়েছিল যে ও ছোটখাটো খেলনা নিয়ে যেতে পারবে তার নিজস্ব কম্ফোর্টের জন্য। স্কুলে এডজাস্ট হয়ে গেলে আর নিতে পারবেনা। কিন্তু খেয়াল করলাম সে কখনোই গাড়ি গুলো আর বাসায় ফেরত আনছেনা। জিজ্ঞাসা করলে বলতো আমার ফ্রেন্ড নিয়ে গেছে। যদি জানতে চাইতাম ফ্রেন্ডের নাম কি,বলতে পারতো না। বা,যদি অন্য ভাবে বলতাম গাড়ি টা কোথায় রেখেছ বলতো ভুলে গেছি। কদিন ইগনোর করার পর হঠাৎ মনে হলো আচ্ছা ও খালি ভুলে যায় কেন?! বা কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেনা কেন? ওর বাবাকে বলতেই ওর বাবা বলতো তুমি তো জানো ওর সব কিছু তে একটু টাইম লাগবে। ১টা টার্ম গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। হয়তো এডজাস্ট হতে পারছেনা। তাছাড়া স্কুলের এত বড় রুমে তো আগে থাকেনি কখনো হয়তো আসলেই কোন চিপা চাপায় পড়ে গেছে। আমি মেনে নিলাম কথা টা। ভাবলাম ঠিক হয়ে যাবে তাহলে আস্তে আস্তে। এরপর দেখলাম সব কিছু নিয়েই ঝামেলা করছে! হোমওয়ার্ক শিট ঠিক মতো আনছে না। স্কুল থেকে কোন দরকারি নোট দিলে সময় মতো জানতে পারছিনা। টিফিন বক্স পানির বোতল সব উধাও হয়ে যাচ্ছে, কোথায় রাখছে কি নিয়ে কি করছে কিছুই তাল মেলাতে পারছিনা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা শুরু হলো পড়ালেখা টা নিয়ে। দেখা গেল লিখতে বসলেই তার মন নেই; শুধু বাহানা আর বাহানা। হাত ব্যাথা করছে, পানি খাব, অনেক লেখা, কেন লিখতে হবে..দুনিয়ার তালতামশা সুবহানআল্লাহ্। কত কস্ট করে যে হোমওয়ার্কগুলো শেষ করাতাম তা কোন বিশ্লেষণ করে শেষ করা যাবেনা। শেষ করানোর পর মনে হতো বিশাল যুদ্ধ জয় করে বিজয়ী হয়ে ফিরলাম। আর হাতের লেখার কথা কি আর বলবো?! এত বাজে হাতের লেখা হতো খালি ভাবতাম যেকোন দিন কিছু লেখে নাই তারও তো মনে হয় এমন না লেখা। আদিয়ানের লেখার ধরন দেখে মনে হতো এখনি রকেট ছুটলো ওর লেখার উপর দিয়ে আর অক্ষর গুলো যেন এক একটা ক্ষতবিক্ষত তারা, রকেটের ছুটে সেগুলো ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। প্রতিদিন ডায়রিতে বিভিন্ন কমপ্লেইন আশা শুরু হলো। আজ এটা করেছে তো কাল ওটা। এমন হলো যে আমি স্কুলের ডায়রি খুলতেই ভয় পেতাম। ডেকে পাঠানো তো ছিলই; প্রতি ২/৩সপ্তাহ অন্তর ডেকে পাঠাতো। ক্লাস টিচার আর প্রিন্সিপাল দুজনই সাপোর্টিভ ছিলেন খুব। কমপ্লেইন করলেও তারাও বিভিন্নভাবে সল্যুশন দেওয়ার ট্রাই করতেন। কথা প্রসঙ্গে জানালাম তাদের ওর প্রিম্যাচিউরিটির কথা. বললাম। প্লিজ তোমরা আদিয়ানকে একটু সময় দাও, আশা করি কিছু সময়ের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে...

একই ভাবে চলতে লাগলো প্রতিটা দিন। কোন ইম্প্রুভমেন্ট নেই। তবে কিছু কিছু ব্যাপার খুব ভালো লাগতো। স্কুলে ম্যাথ্স আর ইংলিশের বানান,উচ্চারন ইত্যাদি শেখার জন্য এপস ব্যবহার করতো, যার নাম ছিল spelling mastery আর matheletics। খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতাম এই দুই হোমওয়ার্ক সে খুব ভালো ভাবে করতো। আর এ দুটো এনজয় ও করতো। ধরে নিয়েছিলাম যেহেতু এটা স্ক্রিনে দেখছে তাই মজা পাচ্ছে। তবে তা হলেও খুব কাজ হয়েছিল এতে। আমি লক্ষ্য করলাম ও মুখে মুখে খুব সুন্দর করে ছোট ছোট কাউন্টিং আর যোগ বিয়োগ গুলো করছে। আর অ্যালফাবেট উচ্চারন করতে করতে মাশাআল্লাহ্ অনেক অল্প সময়ে বিভিন্ন উচ্চারন খুব সুন্দর করে একা একাই শিখে গেল। হঠাৎ খেয়াল করলাম সে আমার সাহায্য ছাড়াই সব ধরনের বই পড়তে পারছে! খুব ভালো লাগতে লাগলো তখন আর মনে হতে লাগলো নাহ্, ঠিক হয়ে যাচ্ছে তাহলে। যখনি এমন ভাবা শুরু করতাম আবার দেখতাম তার কোন কোন দুস্টুমির কাহিনি ডায়রির পাতায় জুরে বসে আছে, আর অমনোযোগিতা তো আছেই. ৩য় টার্ম যখন শেষের দিকে আমি নিজে হাল ছেড়ে দিলাম। কারন ২য়বার মা হবার সময় ঘনিয়ে এসেছিল আর শরীরে কুলাতে পারছিলাম না। ভাবলাম, যেভাবে চলছে চলুক, সামনের বছরটা থেকে আরো একটু যত্ন করবো হয়তো অমনোযোগীতা টা কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ্।


ছোট বোন হবার পর এখন তো আরো স্কুলে যেতে ইচ্ছা করেনা! তার উপর সাথে নানা নানু আছে, সোনায় সোহাগা অবস্থা। পুরা মাথায় উঠে বসে আছে আদিয়ান। যেন সারাক্ষন ডানা ঝাপটানো পাখি। আমি সারাদিন আদিয়ান এটা করিস না,ওটা করিস না বাবু ব্যাথা পাবে বলতে বলতে টায়ার্ড হয়ে যেতাম। সে তার মতোই যা ইচ্ছা করে। কিছু বললেই দেখতাম কেদে কেটে অস্থির। এত বেশি কথায় কথায় কাদতে শুরু করলো যে খুবই বিরক্ত হতে লাগলাম। খেয়াল করেছিলাম সে অত মাত্রায় ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছে। যে কিছুই হোক না কেন, ইমোশনের বাধ মানছেনা তার। ধরে নিয়েছিলাম আমি যেহেতু এখন পুরো সময়টা শুধু ওকেই দিতে পারছিনা তাই এমন করছে. বুঝাতাম. স্কুলের একটা বছর শেষ হলো কোনরকম ভাবে. আদিয়ান আল্লাহর রহমতে খুব ভালো না করলেও মোটামুটি ভালোই করেছিল। এরপর ক্লাশ ওয়ানে উঠার পালা... অপেক্ষা করতে লাগলাম ২০১৬ সালের জন্য...

চলবে...

এখানে, আপনাদের কাছে কুইজ আছে! যারা মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন লেখাটি কেউ কি বলতে পারবেন এখানে আপনারা এডিএইচডির কোন লক্ষন খুজে পেয়েছেন কিনা?? খুজে পেলে আমাকে কমেন্টে জানান প্লিজ। আমি কিন্তু তখন বুঝতে পারিনি। আমি এগুলো জানতে পেরেছিলাম আরো অনেক পরে... কিভাবে, তা লিখবো এভাবেই . জানাবো একটু একটু করে... 


প্রথম পর্বের লিংক https://www.modestbd.com/blog/life-with-adhd-attention-deficit-hyperactivity-disorder



***এই সাইটের লেখার কপিরাইট মডেস্ট কালেকশন এর। লেখা আপনি অবশ্যই শেয়ার করতে পারেন, সেটা আমাদের সাইট থেকে লিংক শেয়ারের মাধ্যমে। কিন্তু কপি পেস্ট করে নিজের প্রোফাইল বা পেইজে দেয়ার অনুমতি আমরা দিচ্ছিনা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।