Parenting

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি (৫ম পর্ব)

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি (৫ম পর্ব)

আমার আদিয়ান আর তার এডিএইচডি


২০১৬ সাল,মানে আদিয়ান তখন ক্লাস ওয়ানে উঠে গেল। একই রকম করে পড়াশুনা চলতে লাগলো। ছোট ছোট দুটো বাচ্চা নিয়ে আমার দিন ভালো কাটলেও সারাক্ষন ছেলেটার অমনোযোগীতা টা আমাকে সারাক্ষন ভাবাতো। হাতের লেখা তো কিছুতেই ভালো করতে পারছিলাম না। আশা ও ছেড়ে দিয়েছি যে সবার সব সন্তান একরকম হয়না। আমার ছেলেটার আসলে কখনো ভালো পড়াশুনা করার মতো ক্যাপাবেলেটি হবে না। স্কুল থেকে কমপ্লেইন আসা টা নিত্য ব্যাপার হয়ে গেল। বলা যায় আমার ও গা সয়ে গিয়েছিল। আমিও কেমন জানি আদিয়ানের সব ব্যাপারে উদাসীন হয়ে গিয়েছিলাম। কারন সব কিছুই তো দেখতাম সে আমলে নিচ্ছেনা। ডাকতে ডাকতে কাহিল হয়ে যেতাম. কিছুই বলা যেতনা, ছিচকাদুনে হয়ে গিয়েছিল প্রচন্ডরকম। অতিরিক্ত ভুলোমনা হয়ে গেছে।

সারা দিনে তার এক্টিভিটিজ গুলো মোটামুটি এরকম: সকালে স্কুল. বাসায় ফিরে গাড়ি নিয়ে খেলা। খাবার খেতে ইচ্ছা করলো তো খেলো নাহলে খাবেনা। হোমওয়ার্ক করবে আর সব শেষ করে গল্পের বই নিয়ে বসে থাকবে। এভাবে ক্লাস ওয়ান টা শেষ হলো ভালো মন্দ মিলিয়ে। তারপর উঠে গেল ক্লাস ২ এ। এবছর টা আদিয়ানের জন্য খুব গুরুত্বপুর্ণ একটা বছর বলতে হবে। আল্লাহ্‌র অশেষ রহমতে আদিয়ানের ক্লাস টিচার টা অসম্ভব কোয়ালিফাইড ভালো একজন টিচার এবং খুব পরিশ্রমী একজন শিক্ষিকা ছিলেন। যেখানে অন্য সব টিচার রা খালি প্রশ্ন করতেন কেন ও একমন করে? সেখানে তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর বের করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন। কারন উনি বুঝতে পেরেছিলেন কয়েকটা জিনিস..

১) যে কোন কাজ দিলে আগেই বলছে আমি তো এটা পারবোনা. আমাকে দিয়ে হবেনা. আত্নবিশ্বাস অনেক কম। আদিয়ান প্রচন্ড ইমপালসিভ কিন্তু একই সাথে অন্যান্যদের প্রতি কমপ্যাশনেট আর রেসপেক্টফুল। যতসব অস্থিরতা তার নিজের সিটের মধ্যেই।

২) সে নিজে মনোযোগ না দিলেও কারো পড়াশুনায় ক্ষতি করছেনা। কারো সাথে মারা মারি করছেনা। কাউকে কটুকথা বলছেনা। সবচেয়ে বড় যে বিষয় টি টিচারকে অবাক করেছিল তার বন্ধুত্ব নিয়ে কোন মাথাব্যথা নাই। তার স্পেসিফিক কোন বন্ধু নাই। সে সারাক্ষন একা একাই থাকে। একা খেলে. একা একাই কথা বলছে বা বোঝা যায় দিবা স্বপ্ন দেখছে।

৩) আদিয়ান সব কিছুতেই সময় বেশি নিত। আদিয়ানকে যখন একটু আলাদা করে তিনি গাইড করতেন তখন একটু দেরি হলেও খুব সুন্দর করে আদিয়ান তার কাজ শেষ করছে। সমস্যা একটা যায়গায়.. বারবার পুশ করতে হচ্ছে।

৪)হয়তো খুব আগ্রহ নিয়ে আদিয়ান কিছু একটা টিচারকে বলতে চাইলো কিন্তু তার আগেই অন্যকেউ হয়তো বলে দিল তখনই সে খুব কান্না কাটি শুরু করতো বা খুব রেগে যেত।

৫) খুব সহজ কিছু ব্যাপার সে খুব দ্রুত ভুলে যেতে লাগলো যা অত্যন্ত আনএক্সপেটেড ছিল।

৬) কোন লম্বা ইনস্ট্রাকশন দিলে সে গুলিয়ে ফেলতো এবং ট্যান্ট্রাম প্রকাশ করতো।

৭) মাপ ঝোক বিষয় গুলোতে অত্যন্ত দুর্বলতা ছিল।


এই সব লক্ষন গুলো নিয়ে ক্লাস টিচার কাউকে কিছু না বলে রিসার্চ করতে লাগলেন এবং তার ধারনা অনুযায়ী তিনি তার সিদ্ধান্তে পৌছে গেলেন। তিনি তার পরও আমাকে বা প্রিন্সিপাল কে তখনও কিছুই জানাননি। তিনি আগে স্কুলে কাউন্সিলরের সাথে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বললেন এবং কাউন্সিলর আদিয়ানকে আলাদা ভাবে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা নিরিক্ষা করলেন। অতঃপর তারা দুজনই তাদের মতো সিদ্ধান্তে পৌছালেন যে কম হোক বেশি হোক আদিয়ান একটি অনিরাময় যোগ্য নিউরোজিক্যাল সিম্পটম বহন করছে যাকে কিনা ADHD বলে। অথবা attention deficiency hyperactivity disorder


টিচাররা দেরি করলেন না.. আমাদের কে চিঠি পাঠালেন। খুব তাড়াতাড়ি দেখা করতে বললেন। কেন দেখা করতে হবে তাও জানালেন।

ADHD কি আবার??? আমার তো মাথা খারাপ অবস্থা। এবং যথারীতি ছেলের বাবা কথাটা বাতাসে উড়িয়েই দিলেন। বললেন.. আরে, আমিও ছোটবেলায় এমন ছিলাম, বাদ দাও তো! স্কুলের সবকিছু একটু বেশি বেশি বাড়াবাড়ি। আমি কিছুক্ষনের জন্য দমে গেলাম। প্রচন্ড মন খারাপ হলো। ভাবতে লাগলাম... আল্লাহ্, আর কত কি দেখাবে তুমি?! আমরা স্কুলে গেলাম না। ২সপ্তাহ অপেক্ষা করে প্রিন্সিপ্যাল আবার চিঠি পাঠালেন। তাও গেলাম না। এরপর ১ সপ্তাহ পর তিনি ফোন দিলেন। বল্লেন, আমি কিছুই শুনতে চাইনা, আপনারা এখনি আসবেন প্লিজ।


স্কুলে পৌছানোর পর দেখি টিচার , কাউন্সিলর আর প্রিন্সিপাল ৩জনই বসে আছে। আমরা বাবা মা দুজন একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়াই করলাম। বসলাম... তারা পেপার ওয়ার্কসহ সব কিছু আমাদের দেখালেন। সব খুলে বল্লেন। এবং আমাদের কে পরামর্শ দিলেন যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে। বাকি স্টেপ গুলো তারাই ভালো বুঝাতে পারবেন। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাসায় ফিরলাম। কেউ কারো সাথে কথা বলছিনা। আমার কি মনে হলো... আমি গুগলে সার্চ করা শুরু করলাম। একটা ভিডিও দেখে আমি কেদে ফেললাম... এবং তখনই আমার মনে হলো স্কুল কর্তৃপক্ষের কেউই ভুল বলছেনা! আমার ছেলের ADHD আছে.. কারন আমার আদিয়ান কে কিছু জিজ্ঞাসা করলে তো ও ঠিক এইভাবেই এই মেয়েটার মতো উত্তর দেয়...

(খুব মনোযোগ দিয়ে ভিডিও টি দেখবেন আশা করি। একটা সুস্থ বাচ্চা আর এডিএইচডি সমপন্ন বাচ্চার বাচনভংগি কথা বার্তায় অনেক তারতম্য খুজে পাওয়া যায়। ইউটিউব, গুগল ভর্তি রিসোর্স. খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে জানার অনুরোধ রইল) 




চলবে...

প্রথম পর্বের লিংক https://www.modestbd.com/blog/life-with-adhd-attention-deficit-hyperactivity-disorder



***এই সাইটের লেখার কপিরাইট মডেস্ট কালেকশন এর। লেখা আপনি অবশ্যই শেয়ার করতে পারেন, সেটা আমাদের সাইট থেকে লিংক শেয়ারের মাধ্যমে। কিন্তু কপি পেস্ট করে নিজের প্রোফাইল বা পেইজে দেয়ার অনুমতি আমরা দিচ্ছিনা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।