নিউবর্ণ বাবুকে দেখতে গেলে যা জানতে হবে

মন ভালো খারাপ যেমনই থাকুক না কেন নতুন একটা বাবুকে দেখলে সকলেরই অন্তরটা প্রশান্ত হয়ে যেতে চায়। নিউবর্ণ বাবু দেখলে কার না আদর করতে মন চায়? তুলতুলে বাবুটাকে কোলে নিয়ে আদর করতে সবারই তো ভাল লাগার কথা। পরিচিত মানুষদের বাবু হয়েছে শুনলেই তো মনটা ভালো হয়ে যায়। ছুটে যেতে ইচ্ছা হয় এক ঝলক দেখে আসতে। তবে সেই ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে আমরা বুঝে না বুঝে কিছু ভুল করে বসি। সেগুলো হয়তো বাবুটা বা তার মায়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কষ্টের কারনও হতে পারে। তাই নিউবর্ণ বাচ্চাকে দেখতে যাওয়ার সময় যে বিষয় গুলো অবশ্যই মাথায় রাখাটা জরুরি তা হল-

 

১. দুয়া : শুরুতেই এই খুশির সংবাদ এ দুয়া করে ফেলতে হবে। নিউবর্ণ বাচ্চার খবর শুনে যেই দুয়া পড়তে হয় তা হল-

بَارَكَ اللَّهُ لَكَ فِي الْمَوْهُوبِ لَكَ، وَشَكَرْتَ الْوَاهِبَ، وَبَلَغَ أَشُدَّهُ، وَرُزِقْتَ بِرَّهُ

আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছেন তাতে আপনার জন্য বরকত দান করুন, সন্তান দানকারীর শুকরিয়া আদায় করুন, সন্তানটি পরিপূর্ণ বয়সে পদার্পণ করুক এবং তার সদ্ব্যবহার প্রাপ্ত হোন। [১]

বা-রাকাল্লা-হু লাকা ফিল মাউহুবি লাক, ওয়া শাকারতাল ওয়া-হিবা, ওয়া বালাগা আশুদ্দাহু, ওয়া রুযিক্তা বিররাহু

অভিনন্দনের জবাবে বলবে,

بَارَكَ اللَّهُ لَكَ وَبَارَكَ عَلَيْكَ، وَجَزَاكَ اللَّهُ خَيْراً، وَرَزَقَكَ اللَّهُ مِثْلَهُ، وَأَجْزَلَ ثَوَابَكَ

আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন, আর আপনার উপর বরকত নাযিল করুন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন, আর আপনাকেও অনুরূপ দান করুন এবং আপনার সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করুন। [২]

বা-রাকাল্লা-হু লাকা ওয়া বা-রাকা ‘আলাইকা, ওয়া জাযা-কাল্লা-হু খাইরান, ওয়া রাযাক্বাকাল্লা-হু মিসলাহু ওয়া আজযালা সাওয়া-বাকা

২. সময়: আমরা আমাদের সুবিধা মত সময়ে হসপিটালে ছুট লাগাই। এটা মোটেও উচিৎ নয়।সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটি এবং তার মা দু’জনারই সে সময় অনেক অনেক বিশ্রামের প্রয়োজন। হাসপাতাল বা বাসায় বাচ্চা দেখতে গেলে তাদের বিশ্রামের যেন ব্যাঘাত না ঘটে সেই বিষয়টি আমাদের মাথায় রাখাটা একান্ত জরুরি।

 

৩. উপহার:

উপহার হিসেবে অনেকেই বাচ্চাকে টাকা দেন আর সেটা দেন বাচ্চার হাতে গুঁজে! বিষয়টা খুবই বিপদজনক। টাকাতে লাখ লাখ জীবাণু থাকে যেটা নিউবর্ণ বাচ্চার জন্য মারাত্বকভাবে ক্ষতিকর। তাই যে কোন উপহারই হোক না কেন। বাচ্চার হাতে বা কাছে না দিয়ে বড়দের কে দেওয়াটাই উচিৎ।

 

৪. আদর : যদিও বাচ্চাদের দেখলে একটু নেড়ে চেড়ে টিপে আদর করতে অনেকেরই ইচ্ছে হয়। কিন্তু এই ইচ্ছেটাকে সংবরণ করাটা খুবই জরুরি। বাইরে থেকে এসেই ময়লা হাতে বাচ্চাকে স্পর্শ করে তার গাল টিপে দিয়ে আমরা হয়তো আনন্দ পাই ঠিকই কিন্তু এটা বাচ্চার জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারনও হতে পারে। বাচ্চাকে যদি একান্তই ধরতে ইচ্ছে হয় বা প প্রয়োজন হয় তাহলে অবিশ্যই হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা হেক্সাজল দিয়ে হাত পরিষ্কার করে নিতে হবে। অনেকে আবার সরাসরি বাচ্চার মুখে চুমু দেন সেটার কারনেও বাচ্চা দ্রুত অসুস্থ অথবা চর্মরোগে আক্রান্ত হতে পারে।

 

৫. দেখতে কেমন: নিউবর্ণ বাচ্চা দেখতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যেই কাজটা করা হয় সেটা হল বাচ্চা কার মত দেখতে হয়েছে সেই গবেষণা! এটা খারাপ কিছু না হলেও এটার মাধ্যমে সদ্য প্রসূত মায়ের মনে দারুন ভাবে আঘাত করাও হয়ে থাকে। অসুস্থ মা যখন অনেক ধকলের পর একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে তখনই শুরু হয় বাচ্চা সাদা না কালো, লম্বা না খাটো অথবা বাচ্চার গায়ের রঙ তো মায়ের মত ময়লা হয়েছে!, মনে তো হয় বেশি লম্বা হবে না, নাক দেখি মায়ের মত বোঁচা, থাক যা হয়েছে হয়েছে (খুব অবহেলার স্বরে), ইত্যাদি কথা বার্তা মায়ের মন ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর যাই করুন অসুস্থ মানুষটি যেন আর কষ্ট না পায় সেটা একটু মাথায় রাখাটাও জরুরি।

 

৬. তুলনা : বর্তমানে অনেকেরই ধারনা মতে সিজার হওয়া মানেই সহজ ডেলিভারি! এটা আসলে কোন ব্যাপারই না! শুধুমাত্র যে একবার সিজারের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে সে ছাড়া কেউ বুঝার কথা না বিষয়টা কতোটা ভয়ংকর পেইনফুল! অসম্ভব রকম যন্ত্রনা নিয়ে মা যখন বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করছে, তখন কেউ যদি বলে বসে, আমাদেরও তো বাচ্চা হয়েছে কই এতো তুলু তুলু তো করিনি! অথবা, কি দরকার ছিল সিজার করার নরমাল এর চেষ্টা করলেই হতো আগেকার মানুষের আর বাচ্চা হতো না? জানেন, ব্যাথায় ছটফট করতে থাকা অন্তরটা নিমিষে অন্ধকার হয়ে যায় এই কথা গুলো শুনলে? প্লিজ এই কথা গুলো আমরা না বলি, মা’টাকে একটু সাহস দেই? একটু সহযোগীতা করি?

৭. ভাই বোনদের নিয়ে ঠাট্টা : নিউবর্ণ বাবুর যদি বড় কোন ভাই বোন থাকে প্রথম সাক্ষাতকালে তাদেরকে বলা হয়, “তোমার আদর তো শেষ”। এতে ভালোবাসার পরিবর্তে শিশুদের মনে হিংসার মনোভাব তৈরি হয়। ছোট বাচ্চাটার মনটাও ভেঙে যায়। এর পরিবর্তে নিউবর্ণ বাচ্চার জন্য কোন উপহার নিলে সামান্য একটা উপহার তার ভাই বোনের জন্যেও কিন্তু নেওয়া যায়। আল্লাহ্‌ তা’লা বেশি বেশি হাদিয়া দিতে বলেছেন যাতে সম্পর্ক সুন্দর থাকে। হাদিয়া পেলে কিন্তু সকলেই খুশি হয়। একটা খুশির আমেজে শুধু শুধু একজনের মন ভেঙে দেওয়াটা ভাল কোন কথা না নিশ্চয়?

 

৮. বাচ্চার খাওয়া: জন্মের পর পরই অনেক বাচ্চাই বুকের দুধ পায় না। এই সময়টা মায়েদের জন্য খুবই জটিল। অনেকেই আপসেট হয়ে যান যার ফলে দুধের ফ্লো একদমই কমে যায় সেই সাথে আমরা যদি নেগেটিভ কমেন্ট করতেই থাকি, আল্লাহ্‌ তুমি তো খাওয়াতেই পারছো না!, বাচ্চা তো না খেয়ে মরেই যাবে কৌটার দুধ দাও, বাচ্চা তো খেতে পারছে না টাইপ কথা বার্তা মায়ের জন্য তখন স্টিম রোলার! আমাদের কে বুঝতে হবে মা যতো রিল্যাক্স থাকবে দুধের ফ্লো ততো বাড়বে ইন শা আল্লাহ্‌। তাকে বেশি বেশি পসিটিভ কথা বলতে হবে। তুমি চেষ্টা কর, তুমি পারবে ইন শা আল্লাহ্‌! এই কথাগুলো নতুন মা কে বুস্টার এনার্জি দেয় আলহামদুলিল্লাহ্‌।

 

৯. ছবি তোলা: কিছুদিন আগেই একটা নিউজ হয়েছিল নিউবর্ণ বাচ্চার ছবি তুলতে গিয়ে ফ্ল্যাশের আলোতে বাচ্চার দুই চোখ নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে বাচ্চার ছবি যেই আসে সেই তুলে নিয়ে যায় এবং বাচ্চার সাথে সেল্ফি ও যেন বাধ্যতামূলক! সাস্থ্য সচেতনতা ছাড়াও অনেক অভিভাবকই চাননা তার বাচ্চার ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে বা অন্য কোথাও সমানে প্রচার হতে থাকুক! এটা বাবা মায়ের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। তাই বাচ্চার ছবি অভিভাবক দের অনুমতি ছাড়া কোন ভাবেই তোলা উচিৎ না। প্রত্যেকের অভিমতকে আমাদের সম্মান করা উচিৎ। এছাড়াও আরো কিছু বিষয় বুঝে শুনে আমাদের স্টেপ নেওয়া উচিত। যেমন বাচ্চা বা মায়ের অবস্থা ক্রিটিক্যাল হলে, কেন এখন বাচ্চা নিল, ক্যারিয়ার শেষ হয়ে গেল, এতো খরচ কেমনে বহন করবে বাচ্চার বাবা এই টক্সিক কথাগুলো যতোটা সম্ভব আমাদের পরিহার করে চলতে হবে। রাসূল সা. বলেছেন, বললে ভালো কথা বল নইলে চুপ থাকো। আশা করি সকলেই এখন থেকে আমরা এই বিষয়গুলোর প্রতি আরো সচেতন হব এবং অন্যকে জানানোর মাধ্যমে আরো অনেকেরই উপকার করব, ইন শা আল্লাহ্‌।

সাকিবা আহমেদ
উদ্যোক্তা, ফ্যামিলিকেয়ার

 

[১] এটি হাসান বসরী রাহিমাহুল্লাহর বাণী হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে। দেখুন, তুহফাতুল মাওদূদ লি ইবনিল কাইয়্যেম, পৃ. ২০; তিনি একে ইবনুল মুনযির এর আল-আওসাত্ব গ্রন্থের দিকে সম্পর্কযুক্ত করেছেন।

[২] এটি ইমাম নাওয়াবী তার আল-আযকার গ্রন্থে পৃ. ৩৪৯ উল্লেখ করেছেন। আরও দেখুন, সহীহুল আযকার লিন নাওয়াবী, সলীম আল-হিলালী, ২/৭১৩। আর এর বিস্তারিত তাখরীজ দেখার জন্য গ্রন্থকারের ‘আয-যিকর ওয়াদ দো‘আ ওয়াল ‘ইলাজ বির রুকা’ গ্রন্থটি দেখুন, পৃ. ১/৪১৬।

 

Leave a Reply